প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে—‘জীবন যখন তোমার দিকে টক লেবু ছুড়ে দেবে, তখন তা দিয়ে লেবুর শরবত বানিয়ে নাও।’ সেই কথাটিকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন Bushra Saeed।
জার্মানিতে হিজাব পরাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়েও ভেঙে না পড়ে বরং রসবোধ আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সেটিকে নিজের ব্যবসার বড় প্রচারণায় পরিণত করেছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা। তার এই প্রতিক্রিয়া এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হচ্ছে।
গত মার্চে Miss Germany প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেন ২৭ বছর বয়সী বুশরা সাঈদ। বর্তমানে এই প্রতিযোগিতায় কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, নারীর ব্যক্তিত্ব, অর্জন ও নেতৃত্বকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বুশরা মূলত একজন উদ্যোক্তা। তিনি নিজে হিজাব পরেন এবং হিজাব ব্র্যান্ড পরিচালনা করেন। মিস জার্মানির মঞ্চেও তিনি নিজের ব্র্যান্ডের হিজাব পরে হাজির হন। জার্মানির ইতিহাসে প্রথম দুই মুসলিম নারীর একজন হিসেবে হিজাব পরে ফাইনালে অংশ নেওয়ায় গণমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি।
তবে এর কয়েকদিন পর বিষয়টি পৌঁছে যায় Bundestag-এ।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক ভাষণে জার্মানির কট্টর ডানপন্থি দল Alternative for Germany (এএফডি)-এর সংসদ সদস্য Beatrix von Storch বুশরাকে আক্রমণ করে বলেন, “মিস জার্মানির ফাইনালে হিজাব! তিনি শুধু হিজাব পরেননি, বরং হিজাব অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবেও কাজ করছেন।”
কিন্তু সেই বক্তব্যে ভেঙে পড়ার বদলে বুশরা সেটিকেই বানিয়ে ফেলেন ‘ফ্রি মার্কেটিং’।
Deutsche Welle-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি অবাক হইনি। বরং খুশি হয়েছিলাম। কারণ আমি যে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির বার্তা ছড়াতে চেয়েছিলাম, সেটি জার্মান সংসদে পৌঁছে গেছে।”
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি রসিকতা করে বলেন, “এএফডির এক ‘বান্ধবী’ সংসদে দাঁড়িয়ে আমার ব্র্যান্ডের ফ্রি প্রচারণা করে দিয়েছেন।”
ভিডিওতে তিনি আরও বলেন, “এটি যেহেতু তার প্রথম কোলাবোরেশন, তাই ডিসকাউন্ট কোড বলতে ভুলে গেছেন। কোডটি হলো— ‘AFD10’। এটি ব্যবহার করলে সব হিজাবে ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন!”
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। শুধু ইনস্টাগ্রামেই এটি ৬০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে।
এই ঘটনার পর বুশরার ব্র্যান্ডের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তিনি জানান, শুধু মুসলিমরাই নয়, অমুসলিম নারী-পুরুষও সংহতি জানিয়ে তার দোকান থেকে হিজাব কিনতে শুরু করেন। এমনকি খ্রিস্টান নারী যাজকরাও তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে হিজাব অর্ডার করেন।
বর্তমানে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীর সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে।
এএফডির নীল রঙের সঙ্গে মিল রেখে বুশরা পরে ‘AFD Blue’ নামে নতুন একটি হিজাব বাজারে আনেন। সেটিও মুহূর্তেই স্টক আউট হয়ে যায়।
বুশরা জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এখন তিনি ঘৃণার জবাব ভালোবাসা ও ইতিবাচকতার মাধ্যমে দিতে শিখেছেন। যদিও সহিংসতা বা হুমকির ঘটনা ঘটলে তিনি সরাসরি আইনি সহায়তা নেন।
সম্প্রতি Social Democratic Party of Germany-এর সংসদ সদস্য Rasha Nasr-এর আমন্ত্রণে তিনি জার্মান সংসদ ভবনও পরিদর্শন করেন।
পুরো ঘটনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন বুশরা। তার ভাষায়, “নেতিবাচক কণ্ঠস্বরগুলো বেশি জোরে শোনা যায়। কিন্তু কঠিন সময়ে মানুষ যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তা প্রমাণ করে সমাজে সংহতি এখনো বেঁচে আছে।”
— পত্রিকা একাত্তর

