আয়ারল্যান্ডে ২৩ বছর থাকা বাংলাদেশি ট্যাক্সিচালককে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দিল হাইকোর্ট
বহিষ্কারাদেশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চলাকালে বদরুজ্জামান মাসুমকে সাময়িক মুক্তির আদেশ, পাসপোর্ট জমা দিতে হবে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
আয়ারল্যান্ডে ২৩ বছর ধরে বসবাস করা এক বাংলাদেশি ট্যাক্সিচালককে শর্তসাপেক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন মুক্তি দিয়েছেন দেশটির হাইকোর্ট। নিজের ট্যাক্সিতে এক তরুণী যাত্রীকে যৌন নিপীড়নের দায়ে সাজা খাটার পর তাঁকে দেশ থেকে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) প্রক্রিয়া শুরু করেছিল দেশটির বিচার বিভাগ। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আইনি চ্যালেঞ্জ চলাকালে আদালত মুক্তির আদেশ দেন।
বিজ্ঞাপন
৪৮ বছর বয়সী ওই বাংলাদেশির নাম বদরুজ্জামান মাসুম। সাজার মেয়াদ শেষে আয়ারল্যান্ডের মাউন্টজয় কারাগার থেকে গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁর বাংলাদেশে ফেরত যাওয়ার কথা ছিল। আদালতের এই আদেশে তাঁর বহিষ্কার প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত থাকল।
আদালত সূত্রে জানা যায়, মাসুম ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষার্থী ভিসায় প্রথম আয়ারল্যান্ডে যান। এর পরের ২৩ বছর দেশটির কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তাঁর ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছে। একসময় তিনি সেখানে দীর্ঘমেয়াদে থাকার সুযোগ এবং অনুমোদিত গণপরিবহনচালক হিসেবে ট্যাক্সি চালানোর লাইসেন্স পান। প্রায় আড়াই দশক ধরে দেশটিতে থাকায় তিনি স্থায়ী বসবাসের অধিকারও পেয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর ভোরে ডাবলিনে তাঁর ট্যাক্সিতে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী যাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী সেখান থেকে পালিয়ে যান। পুলিশি তদন্তে মাসুম গ্রেফতার হন এবং ১৯৯০ সালের সংশোধিত ফৌজদারি আইনের অধীনে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
২০২৫ সালের ১১ মার্চ ডাবলিন সার্কিট ক্রিমিনাল কোর্টে মাসুম অপরাধ স্বীকার করলে বিচারক প্যাট্রিসিয়া রায়ান তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন এবং তাঁর নাম যৌন অপরাধীদের তালিকায় তুলতে নির্দেশ দেন। সাজা খাটার কারণে চলতি বছরের জুনে দেশটির বিচার বিভাগ তাঁর বসবাসের অনুমতি (রেসিডেন্সি) বাতিল করে। আগস্টে বিচারমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁর বহিষ্কারাদেশ জারি হয়।
বিজ্ঞাপন
কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষে গত ৮ সেপ্টেম্বর মাসুমকে অভিবাসনসংক্রান্ত প্রশাসনিক হেফাজতে নেওয়া হয়। সরকারের বহিষ্কারাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তিনি হাইকোর্টে রিভিউ আবেদন করেন। গত ৫ অক্টোবর আদালত সেই আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেন।
শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারক কনলেথ ব্র্যাডলি জানান, আইনি প্রক্রিয়া চলাকালে কাউকে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রশাসনিক হেফাজতে আটকে রাখা যায় না। তাই আদালত কঠোর শর্তে মাসুমকে সাময়িক মুক্তি দেন। আদেশে বলা হয়, তাঁকে অবিলম্বে সব ধরনের ভ্রমণ নথি ও পাসপোর্ট জমা দিতে হবে, ডাবলিনের একটি নির্দিষ্ট ঠিকানায় সার্বক্ষণিক থাকতে হবে এবং আইরিশ পুলিশের কাছে নিয়মিত হাজিরা দিতে হবে।
আদালতে মাসুমের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, প্রায় আড়াই দশক আয়ারল্যান্ডে থাকার ফলে ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অধিকার সুরক্ষিত। সেই কারণে সরকারের একতরফা বহিষ্কারাদেশ সংবিধান ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, অনুমোদিত গণপরিবহনচালক হিসেবে যাত্রীর ওপর এমন যৌন নিপীড়ন জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি এবং সেটিই তাঁকে সরাসরি বহিষ্কারের যথেষ্ট কারণ।
এখন হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ের ওপর নির্ভর করছে ২৩ বছর আয়ারল্যান্ডে কাটানো এই বাংলাদেশির ভবিষ্যৎ। আদালত সরকারের বহিষ্কারাদেশ বহাল রাখলে অভিবাসন পুলিশ অবিলম্বে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে। আর সরকারের সিদ্ধান্ত বাতিল হলে তাঁর বসবাসের আবেদন নতুন করে বিবেচনা করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।