লিবিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিককে অপহরণ করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়, গ্রেপ্তার ২
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ইদ্রিস আলীকে ত্রিপোলিতে অপহরণ, পিবিআইয়ের অভিযানে ফতুল্লায় ধরা পড়ে চক্রের দুই সদস্য
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি · নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ:
লিবিয়ায় এক বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিককে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নির্যাতনের ভিডিও পরিবারকে দেখিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জ জেলা। গ্রেপ্তার দুজন হলেন উত্তম সরকার ওরফে সুমন (৪৪) ও মর্জিনা বেগম (৩৯)। মর্জিনা বেগম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) পিবিআইয়ের ফেসবুক পেজে এ তথ্য জানানো হয়।
পিবিআইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ ২০২৫ লিবিয়ার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানী ত্রিপোলির আনজারা এলাকায় নিজ বাসার সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ইদ্রিস আলীকে (৫৪) অপহরণ করা হয়। উত্তম সরকার ওরফে সুমন, আসলাম, আরিফ মোল্লা ও রাজু মিয়া এবং আরও ৫ থেকে ৬ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি নানা ধরনের অস্ত্র হাতে তিনটি গাড়িতে চড়ে এসে বাসা ঘিরে ফেলেন। তাঁরা ভয় দেখিয়ে অস্ত্রের মুখে ইদ্রিসকে গাড়িতে তোলেন এবং চোখ বেঁধে দেন।
ইদ্রিস আলীর পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, টাকা ও কাগজপত্র অপহরণকারীরা নিয়ে যায়। গাড়িতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা চলার পর এক অজ্ঞাত ভবনের একটি কক্ষে তাঁকে আটকে রাখা হয়।
দুই দিন পর তাঁকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে মারধর করা হয়। ১৯ মার্চ সকালে ইমোতে ভিডিও কল করে তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে সেই মারধরের দৃশ্য দেখানো হয়। সঙ্গে ইদ্রিসকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
এরপর শিপন মিয়ার নামে একটি ইসলামী ব্যাংক হিসাব নম্বর দিয়ে ইদ্রিসের স্ত্রীর কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। টাকা না দিলে হত্যার হুমকি ছিল। স্বামীকে বাঁচাতে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে সেদিনই ২০ লাখ টাকা পাঠান ফাতেমা বেগম।
পিবিআই জানায়, ২০ লাখ টাকা হাতে পেয়ে দুই দিন ইদ্রিসকে মারধর করা হয়নি। কিন্তু তারপর আবার নির্যাতন শুরু হয় এবং আরও ৩০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দিয়ে লোহার রড দিয়ে তাঁর শরীরের নানা জায়গায় আঘাত করা হয়। এতে তাঁর ডান পা ভেঙে যায় এবং শরীরে বিভিন্ন স্থানে জখম হয়।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, দিনে মাত্র একটি রুটি ও এক বোতল পানি দেওয়া হতো ইদ্রিসকে। মারধরের পাশাপাশি দিনের পর দিন তাঁকে অনাহার-অর্ধাহারেও রাখা হয়।
স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে ৬ এপ্রিল ইদ্রিসের স্ত্রী তাঁদের মেয়ের জনতা ব্যাংক হিসাব থেকে আরটিজিএসের মাধ্যমে মঞ্জু নামে একজনের শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক হিসাবে ২৮ লাখ টাকা পাঠান। মঞ্জু চার লাখ টাকা নিজের কাছে রেখে বাকি ২৪ লাখ টাকা পরদিন মর্জিনা বেগমের ইসলামী ব্যাংক হিসাবে পাঠান। একই সময়ে আসামিদের দেওয়া একটি বিকাশ নম্বরে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠান ইদ্রিসের স্ত্রী। ব্যাংক ও বিকাশ মিলিয়ে ইদ্রিস আলীর পরিবার মোট ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেয়।
বিজ্ঞাপন
পিবিআই জানায়, প্রায় এক মাস ১৪ দিন আটক রাখার পর ৮ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইদ্রিস আলীকে চোখ বেঁধে গাড়িতে করে ত্রিপোলির মদিনা এলাকায় নেওয়া হয়। অপহরণকারীরা তাঁকে সেখানে রাস্তার পাশে ফেলে চলে যায়। পরে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় ২২ জুলাই ইদ্রিস আলী দেশে ফেরেন।
ঘটনার পর ইদ্রিস আলী নিজে বাদী হয়ে সোনারগাঁ থানায় মামলা করেন। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সোনারগাঁ থানার মামলা নম্বর ৪১-এ পেনাল কোডের বিভিন্ন ধারায় মামলাটি রুজু হয়। এটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত মামলা হওয়ায় ১৬ সেপ্টেম্বর পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা নিজ উদ্যোগে তদন্তের দায়িত্ব নেয়। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মফিজুল ইসলাম।
তদন্তের অংশ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগিয়ে অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সাইনবোর্ড এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত আসামি উত্তম সরকার ওরফে সুমন ও মর্জিনা বেগম গ্রেপ্তার হন।
গ্রেপ্তারের পর দুজনকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তিন দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়। সেদিনই মর্জিনা বেগম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
বিজ্ঞাপন
প্রাথমিক তদন্তে পিবিআই তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে যে লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে চক্রটি বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের লক্ষ্যবস্তু করত। তাঁদের অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো, আর ভিডিও কলে সেই দৃশ্য পরিবারকে দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও বিকাশ হিসাবের মাধ্যমে টাকা নেওয়া হতো।
চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। মামলার তদন্তও অব্যাহত আছে।