চড়া ভর্তি-টিউশন ফির পরও টানা চার বছর বেড়েছে ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থী
ব্যানবেইসের তথ্য, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষার্থী বেড়েছে ১০ হাজার ৭৬৪ জন
শিক্ষা ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে ভর্তি ও টিউশন ফি অনেক বেশি হওয়ার পরও টানা চার বছর ধরে শিক্ষার্থী বেড়েছে। বিদেশি কারিকুলামে চলা সানিডেল স্কুলে প্লেতে প্রতি শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি ১ লাখ ১৫ হাজার এবং মাসিক টিউশন ফি ২০ হাজার টাকা। মাস্টারমাইন্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে প্লে-গ্রুপের ভর্তি ফি ১ লাখ টাকা, মাসিক টিউশন ফি ১৪ হাজার টাকা।
বিজ্ঞাপন
ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে (আইএসডি) বেতন-ভাতা দিতে হয় মার্কিন ডলারে। সেখানে প্লেতে প্রতি শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি ৯ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ১১ লাখ টাকা), আর টিউশন ফি ৫ হাজার মার্কিন ডলার।
কোনো নীতিমালা না থাকা এবং নজরদারির অভাবে গত পাঁচ বছরে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে ভর্তি ও টিউশন ফি বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। ধানমন্ডি, গুলশান ও উত্তরার ১০টি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রশাসনিক অফিসে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে এসব স্কুলে ভর্তি ফি প্রতি বছর দেড় লাখ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে। মাসিক টিউশন ফি ৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
এত বেশি ভর্তি ও টিউশন ফি নেওয়ার পরও টানা চার বছর ধারাবাহিকভাবে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষার্থী বেড়েছে। মোট বৃদ্ধির হার ১৫.৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৮ হাজার ৮২৫। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১ হাজার ৪৫৬ জনে। ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৭২ হাজার ৭৩৯, ২০২৪ সালে ৭৬ হাজার ৪২ এবং ২০২৫ সালে ৭৯ হাজার ৫৮৯ জন। অর্থাৎ ২০২১ সালের পর থেকে টানা চার বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। চার বছরে মোট শিক্ষার্থী বেড়েছে ১০ হাজার ৭৬৪ জন।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে দেশে জেনারেল মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত এক বছরেই কমেছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯ জন। ২০২৪ সালে এসব স্তরে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ জন, ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ১১২ জন। এ সময়ে শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৫০৭ জন।
এর বিপরীতে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে ২০২৪ সালের ৭৬ হাজার ৪২ জন থেকে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী বেড়ে হয়েছে ৭৯ হাজার ৫৮৯ জন। এক বছরে এ বৃদ্ধি ৩ হাজার ৫৪৭ জন। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থী কমার প্রবণতার মধ্যেও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী বাড়ার ধারা অব্যাহত আছে।
ভর্তি ও টিউশন ফি ছাড়াও প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের বই, স্কুলের ইউনিফর্ম ও সব ধরনের স্টেশনারি পণ্য কিনতে হয় স্কুলের নির্ধারণ করে দেওয়া নির্দিষ্ট কিছু দোকান থেকেই। কোন ক্লাসে পড়ছে, সেই অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষাবর্ষে এই খাতেও শিক্ষার্থীদের বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘৫৬টি নোটবুক, ১৮টি বই, অনেকগুলো কলম, পেনসিল, এমনকি টিস্যু বক্সও কিনে স্কুলে জমা দিতে হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এসব উপকরণ আমার ছেলের আইডি নম্বরের বিপরীতে সংরক্ষণ করবে এবং প্রয়োজনীয় সময়ে তাকে এগুলো দেবে।’
এরপর আসে কোচিং সেন্টারের খরচ। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে কোচিং সেন্টারে যেতে হচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর জন্য কোনো শীর্ষ সংস্থাও নেই, যেখানে অভিভাবকরা অভিযোগ জানাতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমার বড় কারণ হিসেবে শিক্ষাবিদেরা দেখছেন শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতিকে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে বিকল্প শিক্ষাধারার দিকে ঝোঁকার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
ব্যানবেইসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ানো ৯ হাজার ৯৮২ শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় ছিল না। গণিত পড়ানো শিক্ষকদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জনের স্নাতকে গণিত নেই। মোট ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক স্নাতকে অন্য বিষয়ে পড়ে ইংরেজি ও গণিতের ক্লাস নিচ্ছেন। বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতার পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণেও বড় ঘাটতি রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের প্রায় ৪০ শতাংশের বিএড, এমএড, বিপিএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গড় অনুপাতের ন্যূনতম মান ধরা হয় ১:২০, অর্থাৎ প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক। দেশে সাধারণ শিক্ষায় মাধ্যমিক স্তরে এই অনুপাত গড়ে প্রায় ১:৫২, অর্থাৎ প্রতি ৫২ জন শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ১ জন শিক্ষক। কোনো কোনো বড় শ্রেণিকক্ষে এই সংখ্যা ৬০ বা তারও বেশি।
ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সামগ্রিক অনুপাত ১:১০, অর্থাৎ গড়ে প্রতি ১০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। স্তরভিত্তিক হিসাবে এ লেভেল ও জুনিয়র পর্যায়ে অনুপাত ১:১১ এবং ও লেভেলে ১:৮। প্রতি স্কুলে গড়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৫৭ জন। এর মধ্যে এ লেভেল পর্যায়ের স্কুলে গড়ে ৭৬০ জন, ও লেভেলে ২৫০ জন এবং জুনিয়র পর্যায়ের স্কুলে ২৯১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ইংরেজি মাধ্যমের ৯৮ শতাংশের বেশি স্কুল সিটি করপোরেশন এলাকায়। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে এ ধরনের স্কুলের সংখ্যা ছিল ১২৩টি, যা পরের বছরগুলোতে বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে স্কুলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৩টিতে। এর মধ্যে ১৪১টি সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত, অর্থাৎ মোট স্কুলের ৯৮.৬ শতাংশই সিটি করপোরেশন এলাকায়।
চাকরির বাজারে বাড়তি সুবিধা পাওয়াকে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বাড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন অভিভাবক ও শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা। অভিভাবকদের বিশ্বাস, দেশে ও বিদেশে ইংরেজিতে দক্ষ প্রার্থীরা কর্মক্ষেত্রে বাড়তি সুযোগ পান। শিক্ষার মান ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েও একটি ধারণা বেশ জোরালো। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ, পাঠদানের পদ্ধতি ও স্কুলের সুযোগ-সুবিধাকে অনেকে আকর্ষণের কারণ মনে করেন।
এর সঙ্গে রয়েছে সাধারণ শিক্ষার ওপর আস্থার সংকট। শিক্ষাক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং পাঠদানের মান নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু পরিবার বিকল্প ধারার কথা ভাবছে। ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি করানোর যুক্তি হিসেবে দুইজন অভিভাবক বলেন, সন্তানরা ভাষার দিক থেকে এগিয়ে থাকবে, বিদেশে হায়ার এডুকেশনের ভালো সুযোগ পাবে এবং চাকরি নিয়েও দুশ্চিন্তা করতে হবে না। তাঁরা আরও জানান, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে গেলেও ভর্তির ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমের সনদ শিক্ষার্থীদের বাড়তি সুবিধা দেয়।