জানুয়ারি-জুনে ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় কমেছে প্রায় ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা
শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ৫৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ
অর্থনীতি ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুনে দেশের ব্যাংকগুলোর করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) ব্যয় আগের ছয় মাসের চেয়ে কমেছে। গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলো সিএসআরে খরচ করেছিল ১৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা; জানুয়ারি-জুনে তা কমেছে প্রায় ৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগের জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সময়ের সিএসআর কার্যক্রম পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দেশে কার্যরত ৬১টি তপশিলি ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদন বলছে, প্রথম ছয় মাসে মোট সিএসআর ব্যয়ের সবচেয়ে বড় ভাগ গেছে ‘অন্যান্য’ খাতে: ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এরপর স্বাস্থ্যে গেছে ৩৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা (২৯ দশমিক ১১ শতাংশ), শিক্ষায় ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা (২০ দশমিক ২৭ শতাংশ) এবং পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রশমন ও অভিযোজনে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা (৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ)।
‘অন্যান্য’ খাতের ভেতরে সবচেয়ে বড় অঙ্ক ব্যয় হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়, ৩৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা মোট সিএসআর ব্যয়ের ২৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বাকি উপখাতগুলোর মধ্যে অন্যান্য উপখাতে ৫ কোটি ৮৩ লাখ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে ৪ কোটি ৪৬ লাখ, অবকাঠামো উন্নয়নে ২ কোটি ২ লাখ এবং আয়-উৎসারী কার্যক্রমে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার এই ব্যয়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান এবং দেশের শীতপ্রধান অঞ্চলের শীতার্ত ও দরিদ্র মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণের অর্থও আছে।
ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা স্বাস্থ্য খাতের অর্থ মূলত খরচ হয়েছে হতদরিদ্র, অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী রোগীদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা, ক্লিনিক্যাল সেবা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণে। দুরারোগ্য ও জটিল রোগে আক্রান্তদের সরাসরি অনুদানও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্মাণ, পরিচালন ব্যয় এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনায় সিএসআর তহবিল ব্যবহার করেছে ব্যাংকগুলো।
জানুয়ারি-জুনে শিক্ষা খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় ২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এই অর্থ গেছে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ দেওয়ায় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে। তবে গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বরের তুলনায় এ খাতের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তখন ব্যয় ছিল ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, ফলে প্রথম ছয় মাসে শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রশমন ও অভিযোজন খাতে জানুয়ারি-জুনে খরচ হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা, আগের ছয় মাসে যা ছিল ২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। ফলে এ খাতে সিএসআর ব্যয় কমেছে ৫৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এ অর্থে বিভিন্ন এলাকায় বৃক্ষরোপণ, পরিবেশবিষয়ক গবেষণা, মৎস্যজীবীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন সহায়তার মতো কাজ হয়েছে।
ব্যাংকের ধরন অনুযায়ী দেখা যায়, সিএসআর ব্যয়ে বড় অবদান বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৩৩টি জানুয়ারি-জুনে সিএসআরে ১০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা খরচ করেছে, যা ব্যাংক খাতের মোট সিএসআর ব্যয়ের ৮৭ দশমিক ১১ শতাংশ। ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৬টি ব্যয় করেছে ১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ছয়টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের দুটি ব্যয় করেছে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আর বিশেষায়িত তিনটি ব্যাংকের মধ্যে একটির ব্যয় ১১ লাখ টাকা।
ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ১০টি ব্যাংকের জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সময়ের সিএসআর ব্যয় ১৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট সিএসআর ব্যয়ের প্রায় ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর মধ্যে আগের বছরের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা থেকে এসেছে মাত্র ৫ লাখ টাকা; বাকি ১৮ কোটি ৩১ লাখ টাকার জোগান এসেছে নিট মুনাফা ছাড়া অন্য উৎস থেকে। অর্থাৎ এসব ব্যাংকের সিএসআর ব্যয়ের ৯৯ দশমিক ৭৪ শতাংশই এসেছে অন্যান্য উৎস থেকে।
বাংলাদেশে কার্যরত ৯টি বিদেশি ব্যাংকের ছয়টি প্রথম ছয় মাসে সিএসআরে মোট ১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় করেছে, যা ব্যাংক খাতের মোট সিএসআর ব্যয়ের ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এই অর্থের ১২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এসেছে ২০২৫ সালে অর্জিত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা থেকে, যা এসব ব্যাংকের মোট সিএসআর ব্যয়ের ৯৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যান্য উৎস থেকে এসেছে মাত্র ৮ লাখ টাকা।
বিজ্ঞাপন
ব্যাংকের বাইরে দেশে কার্যরত ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সময়ের সিএসআর কার্যক্রমও খতিয়ে দেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট সিএসআর ব্যয় ১ কোটি ৮৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা। তাতে স্বাস্থ্য খাতে গেছে ৭৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা (৪১ দশমিক ৮৫ শতাংশ), শিক্ষায় ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা (৩০ দশমিক ৫১ শতাংশ), পরিবেশ ও জলবায়ুতে ৩০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা (১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ) এবং অন্যান্য খাতে ২০ লাখ ৩০ হাজার টাকা (১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ)।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে সিএসআর কার্যক্রমের বড় অংশ এখনো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। তবে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক সিএসআর ব্যয় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আগের ছয় মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।