তোরাজা জনগোষ্ঠীর মা’নেনে: কবর থেকে তুলে স্বজনদের দেহাবশেষে নতুন পোশাক
মা’নেনে ছাড়াও ‘রাম্বু সলো’ নামের বিশাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ঐতিহ্য রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার এই জনগোষ্ঠীর।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের তোরাজা জনগোষ্ঠীর কিছু পরিবারে মৃত্যুকে সম্পর্কের চূড়ান্ত সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয় না। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কাছে প্রিয়জনকে বিদায় জানানোই শেষ আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু এই পরিবারগুলোতে স্বজনের স্মৃতি, উপস্থিতি ও পারিবারিক বন্ধন ধরে রাখার একটি ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। এই রীতিতে মৃত স্বজনদের দেহাবশেষ যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয়, নির্দিষ্ট সময় পর কবর থেকে বের করে পরিষ্কার করা হয় এবং পরানো হয় নতুন পোশাকও।
বিজ্ঞাপন
আধুনিক বিশ্বের মানুষের কাছে এই দৃশ্য বিস্ময়কর, কারও কাছে অস্বস্তিকরও মনে হতে পারে। তবে তোরাজা সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের কাছে এটি প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রকাশ। পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা তাঁদের কাছে কোনো বিশেষ দিনে ফুল দেওয়া বা প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক বন্ধনের অংশ।
তোরাজা জনগোষ্ঠী ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুলাওয়েসি অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করে। তাদের নিজস্ব ভাষা, সামাজিক রীতিনীতি, স্থাপত্য ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে নৃবিজ্ঞানী ও ভ্রমণপিপাসুদের আগ্রহের বিষয়। এই জনগোষ্ঠীর কিছু পরিবারে মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত ধারণা ও আচার অন্য অনেক সমাজের চেয়ে বেশ আলাদা।
ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারের কেউ মারা গেলে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে চূড়ান্তভাবে সমাহিত করা হতো না। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক প্রস্তুতি এবং নির্ধারিত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজনের ওপর নির্ভর করে মরদেহ দীর্ঘ সময় বাড়িতে রাখা হতে পারত। এ সময় দেহ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কিছু পরিবারে এই অপেক্ষার সময় মৃত ব্যক্তিকে অসুস্থ মানুষের মতো বিবেচনা করার রীতিও আছে। অর্থাৎ মৃত্যু ঘটলেও চূড়ান্ত বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্বজনেরা তাঁকে পারিবারিক জীবনের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখেন। তবে এই রীতি সব তোরাজা পরিবারে একরকম নয়। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে সময়ের সঙ্গে প্রথার ধরনেও বদল এসেছে।
তোরাজা সংস্কৃতির সবচেয়ে আলোচিত আচারগুলোর একটি ‘মা’নেনে’ (Ma’nene)। এতে নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের সদস্যরা পূর্বপুরুষদের সমাধি খুলে দেহাবশেষ বের করেন। এরপর দেহ পরিষ্কার করা, পুরোনো কাপড় বদলে নতুন পোশাক পরানো এবং কফিন বা সমাধিস্থল পরিষ্কার করার মতো কাজ সম্পন্ন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যরা একত্র হন। অনেক দূরে বসবাস করা স্বজনেরাও কখনও কখনও পূর্বপুরুষদের স্মরণে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। তাঁদের কাছে এই আচার মৃতদেহ পরিচর্যার ব্যতিক্রমী পদ্ধতির পাশাপাশি পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপন এবং পূর্বপুরুষদের সম্মান জানানোর উপলক্ষ। কিছু পরিবারে মৃত স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাঁদের স্মরণে খাবার বা অন্যান্য সামগ্রী নিবেদনের রীতিও দেখা যায়। এসব আচারের পেছনে রয়েছে পরিবার, পূর্বপুরুষ ও মৃত্যুপরবর্তী অস্তিত্ব নিয়ে প্রচলিত বিশ্বাস। তবে সব পরিবারে একই ধরনের আচার পালন করা হয় না।
মা’নেনে সাধারণত স্থানীয় রীতি ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পালিত হয়। কোনো কোনো এলাকায় ফসল কাটার মৌসুমের পর এই অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রচলন আছে। পরিবারের সদস্যরা একত্র হয়ে মৃত স্বজনদের স্মরণ করেন, তাঁদের দেহাবশেষ যথাযথভাবে পরিচর্যা করেন এবং আবার সমাধিস্থ করেন।
মৃতদেহ কেন সংরক্ষণ করা হয়, এ প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে তোরাজা সমাজের পারিবারিক মূল্যবোধ ও মৃত্যু নিয়ে তাদের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি জানতে হয়। তাদের কাছে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা সামাজিক পরিচয় ও পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশেষ করে মা’নেনেকে অনেক পরিবার মৃত স্বজনদের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপায় হিসেবে দেখে। যাঁরা একসময় পরিবারকে আগলে রেখেছেন, সন্তানদের বড় করেছেন কিংবা পরিবারের ইতিহাস গড়েছেন, তাঁদের স্মৃতি যেন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে না যায়, এই আকাঙ্ক্ষাই প্রথাটির সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের একটি দিক।
তবে মৃতদেহ দীর্ঘদিন সংরক্ষণের পদ্ধতি সব ক্ষেত্রে এক নয়। ঐতিহাসিকভাবে কিছু পরিবার বিশেষ উপায়ে দেহ সংরক্ষণ করেছে। বর্তমানে সংরক্ষিত দেহাবশেষের পরিচর্যা ও সমাধির ধরন স্থানীয় রীতি, পারিবারিক সামর্থ্য এবং ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী ভিন্ন হয়।
বিজ্ঞাপন
তোরাজাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য ‘রাম্বু সলো’, অর্থাৎ মৃত ব্যক্তিকে ঘিরে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। অনেক ক্ষেত্রে এটি বড় সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যেখানে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা অংশ নেন। আয়োজনটি বেশ ব্যয়বহুল হতে পারে। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ, মাস কিংবা বছর পর আনুষ্ঠানিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়। ঐতিহ্য অনুযায়ী এতে আত্মীয়দের সমাগম, ভোজ এবং নানা সাংস্কৃতিক আচারের বড় ভূমিকা থাকে। তোরাজা সমাজে এই অনুষ্ঠান একজন মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হলেও পারিবারিক সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রকাশেরও উপলক্ষ।
তোরাজাদের এই প্রথার কথা জানলে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ বিস্মিত হন। বিশেষ করে কবর থেকে মৃতদেহ তুলে নতুন পোশাক পরানোর দৃশ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও আলোকচিত্রীদের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। তবে কোনো সংস্কৃতিকে শুধু তার অস্বাভাবিক বা চমকপ্রদ দিক দিয়ে বিচার করলে সেই সমাজের মানুষের বিশ্বাস ও অনুভূতির গভীরতা বোঝা কঠিন। তোরাজাদের কাছে মা’নেনে কেবল একটি বিচিত্র আচার নয়। এটি প্রিয়জনকে মনে রাখা, পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখা এবং পূর্বপুরুষদের সম্মান জানানোর ঐতিহ্য।
বিশ্বজুড়ে মৃত্যুকে ঘিরে আচার-অনুষ্ঠান আলাদা হলেও প্রিয়জনকে স্মরণ করার আকাঙ্ক্ষা সর্বজনীন। কেউ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন, কেউ সমাধিতে ফুল দেন, কেউ প্রার্থনা করেন। তোরাজা জনগোষ্ঠীর কিছু পরিবার নিজস্ব সাংস্কৃতিক রীতিতে মৃত স্বজনদের পরিচর্যা করে সেই ভালোবাসা প্রকাশ করে। তাদের কাছে সময় পেরিয়ে গেলেও পূর্বপুরুষেরা পারিবারিক স্মৃতি ও পরিচয়ের অংশ হয়ে থাকেন।