ধর্মীয় আবেগ নয়, জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে: মীর নেওয়াজ
জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস ও আদর্শ নিয়ে স্পষ্ট উত্তর চান বিএনপির যুববিষয়ক সহ-সম্পাদক
নিজস্ব প্রতিবেদক · ঢাকা
প্রকাশ:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সক্রিয়তা, তরুণদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং দলটির রাজনৈতিক আদর্শ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুববিষয়ক সহ-সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ। তিনি বলেন, শুধু সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা ধর্মীয় আবেগের ওপর ভর করে দীর্ঘ মেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের নীতি, পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
জামায়াতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতা প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের রাজনীতি করার অধিকার আছে। কোনো দল কতটা সক্রিয়, সেটিই বড় বিষয় নয়; সেই সক্রিয়তার মাধ্যমে তারা জনগণের জন্য কী করছে এবং গণতন্ত্রের প্রতি কতটা দায়বদ্ধতা দেখাচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অতীতের ভূমিকা, বর্তমান বক্তব্য ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি—সবকিছুরই জবাবদিহি থাকতে হবে। তাঁর ভাষ্য, জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিভিন্ন সময়ে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান ও মিত্র পরিবর্তনের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে জামায়াতের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের সমঝোতার ইতিহাস নিয়ে জনগণের প্রশ্ন থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন মীর নেওয়াজ। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের আমলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন এবং পরে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনীতি—এসবও রাজনৈতিক মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
ভবিষ্যতে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কোনো রাজনৈতিক জোট বা সমঝোতা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত দেওয়া যথাযথ মনে করেন না তিনি। মীর নেওয়াজ বলেন, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনগণের প্রত্যাশা ও দলের নীতিগত অবস্থান বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
জামায়াত তরুণদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে কি না, এ প্রশ্নে মীর নেওয়াজের দাবি, দলটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আবেগ ও নাম নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে। তাঁর মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ব্যবহার করা উচিত দেশের উন্নয়ন, বৈষম্যহীনতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজে।
কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার মতো বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, তরুণদের আবেগকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার কাজে লাগানো আর তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা এক বিষয় নয়।
জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি ও কর্মীদের শৃঙ্খলা প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেতা বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের শৃঙ্খলা শুধু নিজেদের দাবি দিয়ে প্রমাণিত হয় না; অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তদন্ত, সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও জবাবদিহির মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের পর কতজনের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে এবং কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা দরকার। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বিএনপির কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও যথাযথ তদন্ত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের হাতিয়ার করা উচিত নয়। ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামী এক বিষয় নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলাম একটি ধর্ম, আর জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল। কোনো রাজনৈতিক দল নিজেকে ইসলামের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না। তাঁর মতে, নির্বাচনী সাফল্যকে কোনো ধর্মের বিজয় হিসেবে না দেখিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের নীতি, সততা, কর্মসূচি ও জবাবদিহির মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করা।
বিজ্ঞাপন
রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার এবং জনগণের ম্যান্ডেটের প্রশ্নে দুই দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য আছে বলে জানান তিনি। বিএনপি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারকে গুরুত্ব দেয় বলেও উল্লেখ করেন।
জামায়াতের উত্থান বিএনপির ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলতে পারে কি না, জানতে চাইলে মীর নেওয়াজ বলেন, বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি দেশের জনগণ। অন্য কোনো দলের রাজনৈতিক অবস্থান বা সাফল্যকে কেন্দ্র করে বিএনপি নিজেদের রাজনীতি পরিচালনা করে না বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলায় বিএনপির প্রধান কৌশল হওয়া উচিত জনগণের আস্থা অর্জন, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করা এবং কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও জননিরাপত্তার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
জামায়াতের রাজনৈতিক শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে তিনি বলেন, দলটির সংগঠন ও মাঠপর্যায়ে কাজ করার সক্ষমতা শক্তির জায়গা হতে পারে। তবে রাজনৈতিক ইতিহাস, আদর্শ ও রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে থাকা প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর দেওয়া দরকার। আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় শক্তি হতে হলে অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান, নারীর অধিকার, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার বিষয়ে জামায়াতকে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে বলেও মনে করেন মীর নেওয়াজ।
সাধারণ ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো দলের স্লোগান, আবেগ বা বাহ্যিক ভাবমূর্তি দেখে নয়; রাজনৈতিক ইতিহাস, নীতি, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনা যাচাই করা জরুরি বলে তাঁর মত।