চর্বির কোষ ধ্বংসকারী নতুন ইনজেকশন সিবিএল-৫১৪, প্রাথমিক ট্রায়ালে সম্ভাবনাময় ফল
টানা ১২ সপ্তাহ ইনজেকশন নেওয়া ৪১ জনের দলে ভিসারাল ফ্যাট গড়ে ১২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ কমেছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
সায়েন্স এলার্টের খবরে বলা হয়েছে, ওজন ও মেদ কমানোর প্রচলিত কৌশলের বাইরে গিয়ে একটি ব্যতিক্রমী চিকিৎসাপদ্ধতির প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সম্ভাবনাময় ফল পাওয়া গেছে। বেশির ভাগ ওজন কমানোর ওষুধ যেখানে মেদকোষ বা চর্বির কোষ ছোট করে, সেখানে এই নতুন ইনজেকশন মেদকোষগুলোকে নিরাপদে ও স্বাভাবিকভাবে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলে।
বিজ্ঞাপন
গবেষণাধীন এই ওষুধের নাম ‘সিবিএল-৫১৪’, যা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। ত্বকের ঠিক নিচের মেদ বা সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট কমানোর পাশাপাশি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে জমে থাকা মেদ বা ভিসারাল ফ্যাট কমাতেও এটি কার্যকর বলে প্রমাণ মিলেছে।
ট্রায়ালের নেতৃত্বে থাকা বার্মিংহামের ইউনিভার্সিটি অব অ্যালাবামার এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট টিমোথি গার্ভি বলেন, চর্বি কমলে পেট সমতল হওয়ার মতো যেসব প্রসাধনগত পরিবর্তন আসবে, তাতে রোগীরা সন্তুষ্ট হবেন বলে তারা আশা করছেন। তবে শরীরের ওজন ও ভিসারাল ফ্যাট কমার পাশাপাশি রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ইত্যাদির উন্নতিই স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তবে এই ফলাফল এখনও পিয়ার-রিভিউড বা সহকর্মী গবেষকদের দ্বারা পর্যালোচিত হয়নি। এগুলো গবেষণা সম্মেলন ও কোম্পানির বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, কোনও সাময়িকীতে নিবন্ধ হিসেবে নয়। তাই বিষয়টিকে আপাতত সতর্কতার সঙ্গেই দেখতে হবে।
গবেষণার একাধিক ধাপের মধ্যে সিবিএল-০২০৪ ও সিবিএল-০২০৫ নামের দুটি দ্বিতীয় পর্যায় বা ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যথাক্রমে ১০৭ ও ১৭৩ জন স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন। তাতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ স্বেচ্ছাসেবকের ত্বকের নিচের চর্বি কমাতে সিবিএল-৫১৪ বেশ কার্যকর।
বিজ্ঞাপন
পরে ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ৪১ জনের একটি দলের ভিসারাল ফ্যাটের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, টানা ১২ সপ্তাহ সিবিএল-৫১৪ ইনজেকশন নেওয়া ব্যক্তিদের ভিসারাল ফ্যাট গড়ে ১২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে প্লাসিবো বা ওষুধবিহীন বিকল্প চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের অভ্যন্তরীণ চর্বি শেষ ইনজেকশনের চার সপ্তাহ পর গড়ে ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়েছে।
গবেষণার বাইরে থাকা যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারী বিশেষজ্ঞ মারি স্প্রেকলি বলেন, এই ফলাফল প্রাথমিক আশ্বাসদায়ক প্রমাণ দেয় যে সিবিএল-৫১৪ পেটের ভেতরের চর্বির পরিমাণ কমাতে পারে। তবে মেদ কমানোর এই প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী কি না এবং এটি স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় কি না, তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও বড় ট্রায়াল দরকার।
প্রাণীদের ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, জিএলপি-১ গোত্রীয় ওষুধ ‘টিরজেপাটাইড’ ও ‘সিবিএল-৫১৪’ একসঙ্গে দেওয়া ইঁদুর শুধু টিরজেপাটাইড পাওয়া ইঁদুরের চেয়ে বেশি ওজন হারিয়েছে। আরও লক্ষণীয়, চিকিৎসা বন্ধের পরও দুটি ওষুধ পাওয়া ইঁদুরগুলোর ওজন সহজে বাড়েনি। সাধারণত টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত জিএলপি-১ ওষুধ বন্ধ করলে হারানো ওজন দ্রুত ফিরে আসে। কিন্তু সিবিএল-৫১৪ মেদকোষকে স্বনিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করে বলে ওজন সহজে ফেরত আসে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেটাবলিজম গবেষক জাস্টিন রচফোর্ড সতর্ক করে বলেছেন, স্থূলতার কার্যকর চিকিৎসা হতে হলে এটি যেন অন্যান্য অঙ্গে চর্বি জমতে না দেয় বা রক্তে শর্করা ও চর্বির নিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাত না ঘটায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
গবেষকরা এখন আরও বড় দলে দীর্ঘ সময় ধরে ট্রায়াল চালানোর পরিকল্পনা করছেন। সিবিএল-৫১৪ মূলত ত্বকের নিচে চর্বির পিণ্ড বা ‘লাইপোমা’ দূর করার জন্য তৈরি হয়েছিল, তবে মেদকোষ দূর করার এই লক্ষ্যভিত্তিক পদ্ধতি এখন স্থূলতা চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলছে। টিমোথি গার্ভির মতে, ‘স্থূলতার ওষুধভিত্তিক চিকিৎসায় এটি একটি অত্যন্ত উদ্ভাবনী পদ্ধতি, যা মানুষের ওপর চালানো প্রাথমিক পরীক্ষায় চমকপ্রদ ফলাফল দিয়েছে’।