প্রয়োজন না থাকলেও ছাড় দেখলে কেনাকাটার তাগিদ কেন হয়
২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে ২৩১টি নমুনার ৭৫ হাজারের বেশি ক্রেতার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে
লাইফস্টাইল ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
দোকানে ঢোকার সময় আপনার কিছু কেনার ইচ্ছাই ছিল না। পণ্যটি যে দরকার, সে কথাও হয়তো জানতেন না। হঠাৎ চোখে পড়ল লাল অক্ষরের লেখা ‘৫০ শতাংশ ছাড়!’ তার পাশে আরেকটি ঘোষণা, ‘অফার শেষ হচ্ছে আজই।’ নিমেষে হিসাব উল্টে গেল। মনে হলো, এখন না কিনলে ঠকতে হবে। কিছুক্ষণ আগেও যা অদরকারি ছিল, তা হাতছাড়া করতে এখন মন সায় দিচ্ছে না। শেষমেশ কিনেই ফেললেন। বাড়ি ফেরার পর প্রশ্ন উঠল, জিনিসটা সত্যিই কি দরকার ছিল, নাকি ছাড়ের লোভেই কেনা?
বিজ্ঞাপন
এ অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই চেনা। প্রয়োজন না থাকলেও ছাড় দেখলে কেনার তাগিদ জাগে। এর পেছনে কাজ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মনস্তত্ত্ব, টাকা খরচের অনুভূতি এবং বিপণনের কৌশল। গবেষণায় দেখা গেছে, দামে ছাড়সহ নানা প্রচারণা মানুষের হঠাৎ কেনাকাটা বা ‘ইমপালস বায়িং’-এর ঝোঁক বাড়াতে পারে।
একটি উদাহরণ ধরা যাক। একটি শার্টের দাম ২ হাজার টাকা, কিন্তু সেটি মিলছে ১ হাজার টাকায়। শার্টটি কেনার কথা হয়তো আপনার মাথাতেই ছিল না। তবু ছাড়ের অঙ্ক দেখে মনে হলো, ১ হাজার টাকা বেঁচে যাচ্ছে।
এখানে মনের একটি সূক্ষ্ম কৌশল কাজ করে। পণ্যের প্রয়োজন দিয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে আমরা অনেক সময় মাপি, কত টাকা ‘বাঁচাতে’ পারছি। অথচ পণ্যটি না কিনলে ১ হাজার টাকা খরচই হতো না। অর্থাৎ বাস্তবে সাশ্রয় না হলেও মনে সাশ্রয়ের বোধ তৈরি হতে পারে।
আচরণগত অর্থনীতিতে এ ধরনের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা মেলে। দাম কমলে পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ে, কিন্তু সেই আগ্রহ সব সময় আসল প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খায় না। ছাড়ের পরিমাণ, পণ্যের ধরন, কেনাকাটার পরিবেশ ও ক্রেতার মানসিক অবস্থার ওপরও এই ঝোঁক নির্ভর করে।
বিজ্ঞাপন
‘সীমিত সময়ের অফার’, ‘স্টক শেষ হওয়ার আগে কিনুন’ কিংবা ‘আর মাত্র কয়েকটি বাকি’ ধরনের বার্তা ক্রেতাকে তাড়া দেয়। মনে হয়, এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে সুযোগ আর আসবে না।
কোনো সুযোগ বা স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কা থেকে যে প্রতিক্রিয়া জন্মায়, মনোবিজ্ঞানে তার নাম রিঅ্যাকট্যান্স। কোনো কিছু দুর্লভ বা সহজে মিলবে না মনে হলে তার আকর্ষণও বাড়ে। সীমিত সময় বা সীমিত মজুতের প্রচারণায় বিপণনকারীরা এ ধরনের অনুভূতি কাজে লাগাতে পারেন। অনলাইন কেনাকাটা নিয়ে একটি মাঠপর্যায়ের গবেষণাতেও দেখা গেছে, পণ্যের স্বল্পতা ও সময়সীমার মতো কৌশল হঠাৎ কেনার প্রবণতাকে প্রভাবিত করে।
তবে ছাড়ের প্রতিটি বিজ্ঞাপন যে কৃত্রিম সংকট বানায়, তা নয়; কিছু অফার সত্যিই সীমিত হতে পারে। সমস্যা তখনই, যখন তাড়াহুড়োর চাপে ক্রেতা নিজের প্রয়োজন, পণ্যের মান আর মোট খরচ যাচাইয়ের সুযোগ পান না।
কেনাকাটা কেবল প্রয়োজন মেটানো নয়। অনেকের কাছে এটি আনন্দ, উত্তেজনা বা মন ভালো করার একটি উপায়। পছন্দের জিনিস কেনার আগের প্রত্যাশা কেনাকাটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে, আর ছাড়ের ঘোষণা সেই উত্তেজনার সঙ্গে ‘কম দামে পাওয়ার’ আনন্দ জুড়ে দেয়।
বিজ্ঞাপন
২০১৯ সালে জার্নাল অব দ্য অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজিউমার রিসার্চ-এ ছাপা একটি গবেষণায় দেখা যায়, কিছু পরিস্থিতিতে সম্ভাবনাভিত্তিক ছোট ছাড় নির্দিষ্ট অঙ্কের ছাড়ের চেয়েও বেশি টানে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে পণ্যটি বিনা মূল্যে পাওয়ার সামান্য সুযোগের কথা। গবেষকেরা একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে টাকা খরচের মানসিক অস্বস্তি কমে যাওয়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ কোনো অফার কেনাকাটার আনন্দ বাড়ায় এবং একই সঙ্গে খরচের অস্বস্তিও কমিয়ে দিতে পারে। তবে সব ধরনের ছাড় বা সব ক্রেতার ক্ষেত্রে এই ফল একইভাবে খাটে না, কারণ গবেষণাটি নির্দিষ্ট ধরনের প্রচারণা ও পরিস্থিতি নিয়ে হয়েছিল।
দোকানে গেলে পণ্য হাতে নিয়ে দেখা, অন্যটির সঙ্গে তুলনা করা কিংবা কেনার সিদ্ধান্ত নতুন করে ভাবার সুযোগ থাকে। অনলাইনে অনেক সময় সেই বিরতি মেলে না। পরপর পণ্যের ছবি, ছাড়ের ব্যানার, কাউন্টডাউন আর সহজে অর্ডার দেওয়ার ব্যবস্থা কেনার প্রক্রিয়াকে দ্রুত করে দেয়।
২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে ২৩১টি নমুনার ৭৫ হাজারের বেশি ক্রেতার তথ্য খতিয়ে দেখা হয়। তাতে দেখা যায়, হঠাৎ কেনাকাটার পেছনে ব্যক্তিগত প্রবণতা, আবেগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সময় ও অর্থের মতো সম্পদ এবং বিপণনসংক্রান্ত নানা উপাদানের হাত থাকে। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন দেখে সবাই একই রকম কেনাকাটা করেন না; পরিস্থিতি ও মানুষভেদে ফারাক হয়।
তাই ছাড়ের টানে কেনা প্রতিটি পণ্যই ভুল সিদ্ধান্ত, এমন বলা যায় না। দরকারি জিনিস কম দামে পাওয়া নিশ্চয়ই লাভের। কিন্তু অদরকারি পণ্য শুধু ছাড় আছে বলে কিনলে শেষ পর্যন্ত খরচই বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
ছাড়ের ফাঁদ এড়াতে কেনার আগে নিজেকে কয়েকটি সহজ প্রশ্ন করা যায়। ছাড় না থাকলেও কি পণ্যটি কিনতাম? উত্তর ‘না’ হলে প্রয়োজনটি আরেকবার ভাবুন। পণ্যটির দাম কি সত্যিই কমেছে? পারলে অন্য দোকানে দাম মিলিয়ে নিন।
এখনই কি কিনতে হবে? জরুরি দরকার না থাকলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। মোট কত টাকা খরচ হচ্ছে? ছাড়ের অঙ্ক নয়, শেষ পর্যন্ত নিজের পকেট থেকে কত টাকা যাচ্ছে, সেটাই হিসাব করুন।
ছাড়কে সুযোগ হিসেবে দেখা ভালো, কেনার নির্দেশ হিসেবে নয়। কারণ কোনো পণ্য কম দামে মেলা এবং সেটি কেনার প্রয়োজন থাকা এক বিষয় নয়। কেনাকাটার সেরা হিসাব হলো, কত টাকা ছাড় পেলেন তা নয়; খরচের বিনিময়ে সত্যিই কাজের কিছু পেলেন কি না।