বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান

অনেক অপকর্ম ও সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত সদরের সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়রম্যান বহিষ্কৃত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা উজ্জ্বল শেখ এখন হাজতে। একটি চাঁদাবাজির মামলায় আদালতে জামিন নিতে আসলে আদালত তার জামিন না মঞ্জুর করেন। এদিকে উজ্জ্বলের হাজতে যাবার খবরে এলাকার মানুষ আনন্দ প্রকাশ করেছেন।

তার বিরুদ্ধে সদর থানায় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজিসহ ৪টির বেশী মামলা এবং একাধিক জিডি রয়েছে। এ মামলার উকিল অ্যাডভোকেট মোঃ রাকিব হাসান বলেন, রোববার (১৮সেপ্টেম্বর) দুপুরে একটি চাঁদাবাজির মামলায় উজ্জ্বল ও অপর আসামি মহাদেব সিকদার সদরের আমলী আদালতে হাজির দিতে আসলে তাদের জামিন না মঞ্জুর হয়।

তিনি উজ্জ্বলের বিরুদ্ধে মোট ৫টি চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী মামলা বিচারাধীন বলে জানান। মামলার বিবরণে জানা গেছে, এ বছরের এপ্রিল মাসে সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়রম্যান উজ্জ্বল শেখ একই ইউনিয়নের নলদীর চর গ্রামের বিদেশ (দুবাই) প্রবাসী আকরাম শেখের স্ত্রী বিথী বিশ^াসের (৪০) কাছে ১০হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে।

না দিলে তাকে এলাকা ছাড়াসহ মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রাণীর ভয় দেখায়। এরই জের ধরে ২৯ এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে উজ্জ্¦ল শেখ বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্রসহ ৭-৮জন সন্ত্রাসী নিয়ে বিথীর বাড়িতে হানা দিয়ে আলমারি থেকে জোরপূর্বক নগদ ৫লাখ টাকা নিয়ে আসে। এ ঘটনায় বিথী বেগম বাদি হয়ে সদর আমলী আদালতে একটি চাঁদাবাজির মামলা করেন।

পরে আদালত সিআইডিকে মামলা তদন্তের নির্দেশ দেয়। তদন্ত কর্মকর্তা গত জুনে এ মামলার উজ্জ্বলসহ দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জসিট দেন। এামলার বিষয়ে বাদি বিথী বেগম বলেন, ঘটনার কয়েক দিন আগে পাশর্^বর্তী গোবরা গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল বাড়িতে এসে ১০লাখ টাকা দাবি করে।

ঘটনার দিন সকাল ১০টার দিকে উজ্জ্বল, মহাদেব সিকদারসহ ৭-৮জন এসে আমার ওপর আগ্নেয়াস্ত্র ধরে আলমারি থেকে ৫লাখ টাকা নিয়ে যায়। বিষয়টি স্থানীয় মেম্বর, চেয়ারম্যানদের জানালে তারা বলেছে উজ্জ্বল সন্ত্রাসী প্রকৃতির মানুষ মানুষ আপনি আইনের আশ্রয় নেন। তারপর মামলা করি।

উজ্জ্বল দীর্ঘদিন ধরে এলাকার নিরীহ মানুষের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে চাঁদাবাজি করে অসছে। এছাড়া মানুষকে মারধর,ভয়ভীতি একঘরে রাখাসহ বিভিন্ন অপকর্মের সাথে যুক্ত। সম্প্রতি নলদীরচর গ্রামের জুয়েল নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে। সে এখন উজ্জ্বলের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে খড়গ। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এসআই মোঃ আলফাজ হোসেন বলেন, মামলাটির তদন্ত শেষে গত ২৭ জুন উজ্জ্বল ও একই এলাকার মহাদেব সিকদারের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জসিট দাখিল করা হয়েছে। এ মামলা তদন্ত করার সময় উজ্জ্বলের বিরুদ্ধে ৪টি চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী মামলার তথ্য পাওয়া যায়।

প্রসঙ্গত, এক সময় বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের বহিস্কৃত সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান উজ্জ্বল শেখের বিরুদ্ধে সালিশ ও শিক্ষক নিয়োগে বানিজ্য, হিন্দুদের সম্পত্তি দখল, গাছ কাটা, চাঁদাবাজি, মারধরসহ অসংখ্য অপরাধমূলক কর্মকান্ডের অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে।

এ ইউনিয়নের গোবরা, নলদীরচর, খলিশাখালী, বড়কুলা এলাকায় কেউ তার বিরুদ্ধাচারণ করলে তার ওপর নেমে আসে খড়গ। ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে না পেয়ে আওয়ামী লীগের এক গ্রুপের হাত ধরে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। মূলত এ সময় থেকেই শুরু হয় তার রাজত্ব।

২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে স্বতন্ত্র ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী উজ্জ্বলের লোকজন নৌকার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা করতে যাওয়ায় ছাত্রলীগের প্রায় ১৫জনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করে। উজ্জ্বল চেয়ারম্যান হয়ে ২০১৭ সালের এপ্রিলে এ ইউনিয়নের বিভন্ন সড়কে ঝড়ে ভেঙ্গে পড়া গাছের সাথে শতাধিক বনজ গাছ কেটে নিয়ে যায়।

২০১৭ সালের ২৯ জুলাই সিঙ্গাশোলপুর গ্রামের নিরীহ ঘরামি নিলকে উজ্জ্বল চেয়ারম্যানের লোকজন তাকে বেদম মারধর করে। পরদিন বিনা চিকিৎসায় তার মৃত্যু ঘটে। ২০১৮ নভেম্বর জেলা আ’লীগের অফিসের সামনে ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহবায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে উজ্জ্বলের লোকজন প্রতিপক্ষের ৫জনকে আহত করে।

২০১৯ সালের ১৯এপ্রিল দুস্থ্যদের ভিজিডির চাল আত্মসাতের অভিযোগে চেয়ারম্যান উজ্জ্বলের বিরুদ্ধে মেম্বও ও এলাকাবাসি মিছিল-মানববন্ধন করে। ২০১৯ সালের ১মে উজ্জ্বলসহ তার লোকজন সিঙ্গাশোলপুর বাজারে আ’লীগ অফিসে রক্ষিত প্রবেশ বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি, চেয়ার-টেবিল এবং স্থানীয় বাজারের আসাদ ও আক্তার মোল্যার দোকান ভাংচুর করে। ২০১৯ সালে বড়কুলা-টেংরাখালী হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০ একর শত্রু সম্পত্তি দখল করে আবার হিন্দুদের কাছেই কৌশলে বিক্রি করে এবং এ জায়গা থেকে ৫০টির মতো পুরোনো গাছ কেটে নেয়।

উজ্জ্বলের পক্ষ না নেওয়ায় ২০২০ সালের ২অক্টোবর প্রকাশ্যে গ্রাম্য সভা ডেকে নলদীরচর গ্রামের ইকরাম শেখের পরিবারকে একঘোরে করে এবং ওই সালের ১০ ডিসেম্বর ইকরামের ছেলে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আশিক বিশ্বাসকে ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর উজ্জ্বলের লোকজন তাকে কুপিয়ে জখম করে। এখনও ইকরামের ৩ ছেলে উজ্জ্বলের ভয়ে গ্রামে বাড়িতে আসতে পারেনা।

২০২১ সালের ১১নভেম্বর ইউপি নির্বাচনে উজ্জ্বল শেখ স্বতন্ত্র হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচন করে পরাজিত হয়ে সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। উজ্জ্বল ও তার সন্ত্রাসী গ্রুপ নৌকা প্রতিকের পক্ষে কাজ করায় নির্বাচনের দিন পর ১৪ নভেম্বর সিঙ্গাশোলপুর বাজারের ব্যবসায়ী সানোয়ার মিয়ার দোকানে ঢুকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। ৪ ডিসেম্বর গোবরা বাজারের ধান-পাট ব্যবসায়ী আনোয়ার মোল্যার দু’পা ভেঙ্গে দিয়ে সাড়ে ৪লাখ টাকা নিয়ে যায়। ১৪ ডিসেম্বর ইউনিয়ন আ’লীগের দপ্তর সম্পাদক মিশকাত হোসেনকে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়।

সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম হিটু বলেন, উজ্জ্বল শেখ হাজতে যাওয়ার খবরে এলাকার সাধারণ মানুষ খুবই খুশি। সে গোবরা, খলিশাখালী, নলদীরচর বড়কুলো-টেংরাখালি এই কয়টি গ্রামে তার ভয়ে কেউ কথা বলে না। এবার ইউপি নির্বাচনে পরাজিত হবার পর এসব এলাকার অনেকে তার হাতে নির্যাতিত হয়েছে। ভয়ে এখনও অনেক লোক বাড়িতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না।

পত্রিকাএকাত্তর / হাফিজুল নিলু

সম্পর্কিত নিউজ

Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ নিউজ