প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের আগে বদলে গেছে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চেহারা
পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারকাজ চললেও বহির্বিভাগের ৩ হাজার ৫০০ রোগীর জন্য শৌচাগার মাত্র ১০টি
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি · ঢাকা
প্রকাশ:
প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের খবরে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চেহারা বদলে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যে সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারকাজ চালানো হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালসহ ১৩টি হাসপাতাল ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, রান্নাঘর ও শৌচাগারসহ বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করেন এবং ভর্তি রোগীদের খোঁজখবর নেন।
বিজ্ঞাপন
ওই দিন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সহযোগী অধ্যাপক চিকিৎসক রফিকুল ইসলামকে নিজের অপরিচ্ছন্ন কক্ষে ধূমপান করতে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে ওই চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাহান গোলাম সারওয়ার জানান, শনিবার প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালের বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, রান্নাঘর ও শৌচাগার ঘুরে দেখেছেন। রোগীদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন। সংস্কারকাজ ও চিকিৎসাসেবার সমস্যা নিয়ে জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, ‘হাসপাতাল পরিদর্শনের বিষয়টি নিয়ে আমাদের ঘুম হারামের অবস্থা। এ নিয়ে ক্লান্ত, এখন কোন বিষয়ে কথা বলতে পারবো না।’
পরিদর্শনের আগে বৃহস্পতিবার হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারকাজ চলতে দেখা যায়। মেঝে, দেয়াল ও ফ্যান পরিষ্কার করা হচ্ছিল, পাশাপাশি শৌচাগার মেরামত ও রং করা হচ্ছিল। নষ্ট বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরিয়ে নতুন সরঞ্জাম লাগানোর কাজও চলছিল।
সেদিন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক মো. বিন মিজান বলেন, হাসপাতালে নিয়মিতই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ হয়; শুধু মন্ত্রী বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তির পরিদর্শন উপলক্ষে তা করা হয় না। তবে রোগীর চাপ বেশি থাকায় পরিচ্ছন্নতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
পরিদর্শন ঘিরে পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারকাজ চললেও হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা, জনবল ও অবকাঠামোর সংকট থেকেই গেছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ এবং জরুরি বিভাগে প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এত রোগীর জন্য শৌচাগার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধা অপ্রতুল।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৭ জন রোগী সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৪ হাজার ১৫৯ জন। এত রোগীর চাপে চিকিৎসক ও অন্য জনবলের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। বহির্বিভাগে রোগী দেখেন ছয় থেকে আটজন মেডিক্যাল অফিসার।
দাঁতের চিকিৎসাতেও সীমাবদ্ধতা আছে। জায়গা, যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে এ বিভাগে সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। দাঁতের ক্যাপ লাগানোর ব্যবস্থা নেই। নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার, ফিলিং ও দাঁত তোলার চিকিৎসা মিললেও রুট ক্যানাল, জটিলভাবে দাঁত সোজা করা এবং মুখমণ্ডলের অস্ত্রোপচারের মতো চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের পাঁচটি পদ শূন্য। এতে নিউরোসার্জারি, অর্থোপেডিকস, শিশু সার্জারি এবং নাক-কান-গলা বিভাগের অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর চাপও সামলাতে হয় হাসপাতালটিকে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার ডেঙ্গু রোগী এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ রোগীর জন্য শৌচাগার আছে মাত্র ১০টি, যার কয়েকটি নষ্ট থাকায় ব্যবহার করা যায় না। ফলে গড়ে ৩৫০ জন রোগীকে একটি শৌচাগার ব্যবহার করতে হয়। জরুরি বিভাগে প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগীর জন্য রয়েছে পাঁচটি শৌচাগার, এর কয়েকটিও ব্যবহারের অনুপযোগী।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সালমা বেগম বৃহস্পতিবার বলেন, রোগীরা শৌচাগারে পানির বোতল, টিস্যু, স্যানিটারি প্যাড ও কাপড় ফেলে রাখেন। কয়েকটি শৌচাগার মেরামতের কাজও চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের আগে হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারকাজ চললেও রোগীর তুলনায় শৌচাগারের স্বল্পতা, চিকিৎসকসংকট এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা হাসপাতালটির নিয়মিত সেবা কার্যক্রমে চাপ তৈরি করছে।